সূচনা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল সম্মুখ সমরের কাহিনী নয়, এটি ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কৌশলগত যুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত এই স্বাধীনতায় কৃষকের কাস্তে আর ছাত্রের স্লোগানের পাশাপাশি সমান তালে গর্জে উঠেছিল প্রকৌশলীদের (Engineers) মেধা ও প্রযুক্তি। EEE Job Preparation এর পাঠকদের জন্য আজ আমরা তুলে ধরব মুক্তিযুদ্ধের সেই অজানা অধ্যায়, যেখানে প্রকৌশলীরা কলমের বদলে হাতে তুলে নিয়েছিলেন ডিনামাইট, মাইন এবং ট্রান্সমিটার।
১. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: শব্দসৈনিক প্রকৌশলীদের যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের মূল হাতিয়ার ছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। একজন ইলেকট্রিক্যাল বা টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আপনি কল্পনা করতে পারেন, চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি রেডিও স্টেশন চালু রাখা কতটা কঠিন?
-
কালুরঘাট ট্রান্সমিটার: চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের প্রকৌশলীরা, বিশেষ করে প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম, দিলীপ চন্দ্র দাস এবং সৈয়দ আবদুস শাকের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১০ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটারটি সচল রেখেছিলেন। ২৬শে মার্চ এই ট্রান্সমিটার ব্যবহার করেই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়।[1]
-
ত্রিপুরার জঙ্গল ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ: পরবর্তীতে ভারতের আগরতলা এবং পরে কলকাতায় স্থানান্তরের সময় প্রকৌশলীরা পুরনো যন্ত্রপাতি জোড়াতালি দিয়ে, কখনও বা সাইকেলের ডায়নামো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সম্প্রচার চালু রেখেছিলেন। ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামিং এড়াতে তাঁরা যে কারিগরি দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা ছিল অভাবনীয়।[2]
২. অপারেশন জ্যাকপট ও নৌ-কমান্ডোদের কারিগরি দক্ষতা
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সফল গেরিলা অপারেশন ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। যদিও এটি মূলত নৌ-কমান্ডোদের অভিযান ছিল, তবুও এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং নলেজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-
লিমপেট মাইন ব্যবহার: কমান্ডোরা জাহাজের হাল (Hull) এর পানির নিচের অংশে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক মাপে লিমপেট মাইন স্থাপন করতেন, যাতে বিস্ফোরণের ফলে জাহাজটি ডুবে যায় কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস না হয় (যাতে চ্যানেল ব্লক করে রাখা যায়)।
-
শহীদ লেফট্যানেন্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন: তিনি ছিলেন একজন মেকানিক্যাল ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার (ব্রিটেনের ইনস্টিটিউট অফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স থেকে গ্রাজুয়েট)। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম এই আসামি ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন।[3][4] তাঁর কারিগরি জ্ঞান নৌ-কমান্ডো গঠনে প্রাথমিক পর্যায়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।[5]
৩. অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্নকরণ (Sabotage)
মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের মূল কৌশল ছিল শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়া। এই কাজে সিভিল ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান ছিল অপরিহার্য।
-
স্ট্রাকচারাল ডেমোলিশন: একটি ব্রিজের ঠিক কোন পয়েন্টে (Key Point) আঘাত করলে সেটি সবচেয়ে কম বিস্ফোরক ব্যবহার করে ধসিয়ে দেয়া যায়, তা নির্ধারণ করতেন ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ২৩১টি ব্রিজ এবং ১২২টি রেললাইন ধ্বংস করে পাকিস্তানি বাহিনীর সাপ্লাই চেইন অচল করে দিয়েছিলেন।
-
বিদ্যুৎ গ্রিড সাবোটাজ: পাকিস্তানি ক্যাম্পগুলোতে অন্ধকার নামিয়ে আনতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯০টি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ও ট্রান্সমিশন টাওয়ার ধ্বংস করেছিলেন। বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ ও আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের অপারেশনে কারিগরি সহায়তা ছিল মুখ্য।
৪. বুয়েট (তৎকালীন EPUET) এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রকৌশলীরা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা তৎকালীন EPUET ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
-
শহীদ প্রকৌশলীরা: পাকিস্তানি বাহিনী জানত, এই জাতিকে পঙ্গু করতে হলে কারিগরি মেধাবীদের হত্যা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞসহ পুরো যুদ্ধজুড়ে প্রায় ৪০ জন প্রকৌশলীকে হত্যা করা হয়।
-
শহীদ শাফী ইমাম রুমী: যদিও তিনি তখনো ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি, কিন্তু ক্র্যাক প্লাটুনের এই দুঃসাহসী গেরিলা যোদ্ধা তখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের (বর্তমান বুয়েট) ছাত্র ছিলেন। ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ পেয়েও তিনি দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
-
আতাউর রহমান খান খাদিম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও তিনি ছিলেন ইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ।[4] ২৫শে মার্চ রাতে শহীদুল্লাহ হলের এই শিক্ষককে হত্যা করা হয়।[6][7]
৫. প্রবাসে প্রকৌশলীদের ভূমিকা: ড. এফ আর খান
বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ‘ফাদার অফ টিউবুলার ডিজাইন’ খ্যাত ড. ফজলুর রহমান খান (এফ আর খান) তখন যুক্তরাষ্ট্রে। সিয়ার্স টাওয়ারের নকশাকার এই মানুষটি প্রবাসে থেকেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন। তিনি Bangladesh Emergency Welfare Appeal গঠন করেন এবং লবিংয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে ভূমিকা রাখেন।
৬. সেনাবাহিনীতে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর
মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং বিজয়ের ঠিক আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং রেজিমেন্ট (যেমন: ১১১ ও ২৩৫ ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্ট) এবং বাংলাদেশের নবগঠিত ইঞ্জিনিয়ারিং প্লাল্টুনগুলো মাইন অপসারণ (Mine Sweeping) এবং বেইলি ব্রিজ তৈরিতে অসামান্য ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে হিলি সীমান্তের যুদ্ধে ইঞ্জিনিয়ারদের মাইন ফিল্ড ব্রেচিং অপারেশন ছিল সাহসিকতার চরম নিদর্শন।
উপসংহার:
১৯৭১ সালে প্রকৌশলীরা প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশমাতার মুক্তির জন্য কেবল পেশীশক্তি নয়, প্রয়োজন মেধার সঠিক প্রয়োগ। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পদ্মা সেতু বা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগাপ্রজেক্ট দেখি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে সেই অগ্রজ প্রকৌশলীদের কথা, যারা ধ্বংসের মাধ্যমেই সৃষ্টির পথ তৈরি করেছিলেন।
আজকের নবীন ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে সেই দেশপ্রেম ও ত্যাগের মশাল পৌঁছে দেয়াই আমাদের লক্ষ্য। বিজয়ের এই মাসে সকল শহীদ প্রকৌশলী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার টাইমলাইনে। ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন www.eeejobpreparation.com।
তথ্যসূত্র (References for the Blog Post):
-
Banglapedia – Article on “Mukti Bahini” and “Killing of Intellectuals”.
-
Ministry of Liberation War Affairs, Bangladesh – Updated list of Martyred Intellectuals (2021-2024).
-
Wikipedia – Articles on “Operation Searchlight”, “Swadhin Bangla Betar Kendra”, and “Mohammad Moazzem Hossain”.
-
Londoni.co – Biography of Dr. Fazlur Rahman Khan.
-
The Daily Star & Dhaka Tribune – Reports on martyred intellectuals and operation details.